গল্পটা প্রথম পড়েছিলাম নসীম হিজাযীর 'কিং সায়মনের রাজত্ব' বইয়ের ভুমিকায়। আমাদের দেশের বাস্তবতার সাথে কেমন আশ্চর্য একটা মিল এই উপন্যাসের কাহিনীর! আর উপন্যাসটা লেখা হয়েছে মূলতঃ এই গল্পকে ভিত্তি করেই। এক দরবেশ ও তার খাদেমের গল্প। তারা থাকে শহর থেকে দূরে এক বনের মধ্যে। দরবেশ সারাদিন ইবাদত বন্দেগীতে মশগুল থাকে। আর খাদেমের কাজ আশেপাশের লোকালয়ে ভিক্ষা করে খাবার জোগার করা আর দরবেশের সেবা করা। কাহিনী মোটামুটি এরকম:
দরবেশ ছিলেন খুব মানবদরদী। মানুষের দুঃখ কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারতেন না। তাই সে সবসময় আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন, 'হে আমার মালিক, তোমার বান্দাদের দুর্দশা আমি আর সহ্য করতে পারছি না। কিন্তু তাদের যে খেদমত করব - আমার সে সামর্থটুকুও নাই। কাজেই তুমি যদি আমাকে বাদশাহ বানিয়ে দাও, তাহলে আমি দিন রাত জনগণের সেবা করব। গরীব, দুঃখী, অসহায় এবং এতিমদের সাহায্য করব। সব রকম অন্যায় ও খারাপ কাজ প্রতিরোধ করব, আর ন্যায় ও কল্যাণকর কাজে উৎসাহিত করব। রাজ্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করব। অন্যায়কারীদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দেব। সব পানশালা, জুয়ার আড্ডা, অশ্লীলতা-বেহায়াপনার আসর উচ্ছেদ করব, আর সে স্থলে মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করব।...'
কিশোর খাদেমের মনে দরবেশের আন্তরিকতার ব্যাপারে কোন সন্দেহ ছিল না। সে মনে করত, মহান আল্লাহ অবশ্যই তার মুর্শিদের মত ভালমানুষের এহেন আন্তরিক দোয়া কবুল করবেন। আর দরবেশ বাদশাহ হলে তাকেও আর কোন কষ্ট করতে হবে না। কিন্তু দিনের পর দিন পার হয়ে যেতে থাকল। দরবেশ বয়স বেড়ে বার্ধক্যে উপনীত হলেন। খাদেম এখন টগবগে যুবক। কিন্তু দরবেশের দোয়া কবুল হওয়ার কোন লক্ষণ দেখা গেল না। ধীরে ধীরে খাদেমের বিশ্বাসে চির ধরল। শেষ পর্যন্ত অবস্থা এমন হল যে দরবেশ যখন দোয়ার জন্য হাত তুলতেন, খাদেমও তখন তার সাথে হাত তুলতে লাগল। কিন্তু তার কথা ছিল দরবেশের ঠিক বিপরীত। সে দোয়া করতে লাগল, তাকে বাদশাহ বানিয়ে দেয়া হলে সে তার প্রজাদের উপর যথাসম্ভব অত্যাচার করবে। অপরাধীদের সাজা দেয়ার পরিবর্তে পুরষ্কৃত করবে। মসজিদ মাদ্রাসা বন্ধ করে দিবে আর সব রকম অন্যায়, অশ্লীলতার দুয়ার উন্মুক্ত করে দিবে।
কিছুদিনের মধ্যেই দরবেশ-খাদেমের দোয়া কবুল হবার পরিস্থিতি সৃষ্টি হল। তাদের রাজ্যের রাজা মারা গেলেন, আর সিংহাসনের অধিকার নিয়ে রাজবংশের সদস্যরা বিবাদ শুরু করল। এমনকি অবস্থা খারাপ হতে হতে গৃহযুদ্ধ বাধার উপক্রম হল। যে যার অনুগত সেনাবাহিনী নিয়ে মহড়া দেয়া শুরু করল সিংহাসনের দাবিদারেরা। এহেন সংকটময় পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী এক অভিনব প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। ঠিক হল, বর্তমান দাবিদারদের কাউকেই রাজা বানানো হবে না, বরং রাজা নির্বাচনের ব্যাপারটি আল্লাহর ফয়সালার উপর ছেড়ে দেয়া হবে। পরদিন সূর্যদয়ের পরে প্রথম যে ব্যক্তিকে আল্লাহ পূর্ব দিক থেকে রাজধানীতে প্রবেশ করাবেন, তাকেই রাজা বানানো হবে। যথারীতি পরদিন পূর্বদিক থেকে সবার আগে রাজধানীতে প্রবেশ করল আমাদের যুবক খাদেম।
রাজা হয়ে খাদেম অক্ষরে অক্ষরে তার প্রতিজ্ঞা পালন করতে লাগল। জেলখানা থেকে সব দাগী আসামীদের ছেড়ে দেয়া হল। তাদের বদলে গ্রেফতার করা শুরু হল নিরপরাধ আলেম, দরবেশ ও সাধারণ মানুষদের। গরিবের উপর করের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হল। দুঃস্থদের ভাতা বন্ধ করে দেয়া হল। সব রকম জনকল্যাণমুলক প্রকল্প বাতিল করা হল। নতুন রাজা দুর্নীতিবাজ অসাধু কর্মকর্তাদের পুরষ্কৃত করতে লাগল, আর সৎ ও ত্যাগী কর্মকর্তাদেরকে শাস্তি দিতে লাগল। মোট কথা ভুতপূর্ব খাদেম রাজ্যকে পরিণত করল অন্যায়-অবিচার-অশান্তি-নির্যাতনের এক অভাবনীয় মডেলে।
শান্তিতে ছিলনা সেই প্রস্তাব পেশকারী মন্ত্রীও। মন্ত্রিত্ব তো অনেক আগেই হারিয়েছে, এখন সহায় সম্বলও হারানোর পথে। নিরুপায় হয়ে তিনি সুপারিশ করার জন্য লোক খুঁজতে লাগলেন। খুঁজতে খুঁজতে মন্ত্রী এক সময় সেই দরবেশের আস্তানায় গিয়ে পৌঁছলেন। দরবেশের হাতে-পায়ে ধরে অনুরোধ করলেন, 'বাবা যেন দয়া করে এই বিপদের হাত থেকে দেশবাসিকে মুক্ত করে দেন।'
সাবেক খাদেমের কীর্তি-কলাপের কথা আগেই শুনেছেন বয়োঃবৃদ্ধ দরবেশ। ফকির-দরবেশদের উপর নতুন রাজার আক্রোশের কথাও কারও অজানা ছিল না। কাজেই শিষ্যের মুখোমুখি হওয়ার কথা শুনে কিছুটা ভয় পেয়ে গেলেন তিনি। তারপরও মন্ত্রীর বারংবার অনুরোধ ফেলতে না পেরে খাদেমের সাথে কথা বলতে রাজি হলেন। পরদিন সকালে দরবেশ যেয়ে উপস্থিত হলেন রাজদরবারে।
রাজা হয়েও খাদেম কিন্তু তার মুর্শিদকে ভুলে যায়নি। অত্যন্ত আদবের সাথে সে দরবেশকে গ্রহণ করল। তার জন্য ব্যবস্থা করল শাহী খানা-দানার। আপ্যায়ন শেষে খাদেম দরবেশকে তার আগমনের হেতু জিজ্ঞেস করল। জবাবে দরবেশ বললেন, 'দেখ বাবা, আমি নিজের জন্য কিছুই চাইতে আসিনি। কিন্তু তুমি তো জান, মানুষের দুঃখ কষ্ট আমি দেখতে পারি না। আল্লাহর ওয়াস্তে তোমার প্রজাদের প্রতি একটু করুণা কর। একসময় এই তুমিই তাদের কাছে ভিক্ষা করতে, আজ আল্লাহ তোমাকে সম্মানিত করেছেন। কাজেই তাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। ভুলে যেও না, একদিন তোমাকেও মরতে হবে। আর আল্লাহর কাছে তোমার এই সব অন্যায় কাজের জবাবদিহি করতে হবে।'
দরবেশের এমন নিঃস্বার্থ আবদারে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল খাদেম। ক্রোধ-কম্পিত স্বরে বলল, 'দেখুন দরবেশ বাবা, আপনি আমার মুর্শিদ ছিলেন দেখে আজকে আপনাকে ছেড়ে দিচ্ছি। আমার আচরণের জন্য আপনি আমাকে যত খুশি বদদোয়া দিতে পারেন, অভিশাপ দিতে পারেন, কিন্তু এই প্রজাদের সাথে কোনরকম ভাল ব্যাবহার করতে বলবেন না। আমি ভুলে যাইনি যে আমি এক সময় এদের কাছেই ভিক্ষা করে খেতাম। কিন্তু আপনিও নিশ্চয়ই ভুলে যাননি, আমরা কে কী বলে আল্লাহর কাছে দোয়া করতাম। আপনি আমার চেয়ে অনেক বেশি পরহেজগার। আপনি বছরের পর বছর আল্লাহর কাছে অঙ্গীকার করেছেন, আপনি বাদশাহ হলে সুবিচারের সাথে শাসন করবেন। এই মানুষগুলো যদি ভাল ব্যবহারের উপযুক্তই হত, তাহলে তো আল্লাহ আমার পরিবর্তে আপনাকেই এদের বাদশাহ বানিয়ে দিতেন। কিন্তু আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করেছেন। এখন আমি তো শুধু আল্লাহর সাথে করা অঙ্গীকারটুকুই পূরণ করছি। আর আল্লাহর শপথ, এদের সাথে আমার আচরণের আমৃত্যু কোন পরিবর্তন হবে না।
দরবেশ অনেক্ষণ চুপ করে রইলেন। অবশেষে উঠে দাঁড়ালেন, আর শিষ্যকে বললেন, 'বাছা, তুমি ঠিকই বলেছ। এই লোকগুলো যদি কোন রকম ভাল আচরণের যোগ্য হত, তাহলে আমার এত বছরের দোয়া নিশ্চয়ই নিষ্ফল হত না। আল্লাহ তায়ালা এদেরকে শাস্তি দিতে চান বলেই তোমার হাতে রাজদন্ড দিয়েছেন। কাজেই তুমি নিঃশ্চিন্তে এদেরকে শায়েস্তা করতে থাক, আর এ ব্যাপারে কোন রকম কার্পণ্য করো না। আমি চললাম।'
দরবেশ ছিলেন খুব মানবদরদী। মানুষের দুঃখ কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারতেন না। তাই সে সবসময় আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন, 'হে আমার মালিক, তোমার বান্দাদের দুর্দশা আমি আর সহ্য করতে পারছি না। কিন্তু তাদের যে খেদমত করব - আমার সে সামর্থটুকুও নাই। কাজেই তুমি যদি আমাকে বাদশাহ বানিয়ে দাও, তাহলে আমি দিন রাত জনগণের সেবা করব। গরীব, দুঃখী, অসহায় এবং এতিমদের সাহায্য করব। সব রকম অন্যায় ও খারাপ কাজ প্রতিরোধ করব, আর ন্যায় ও কল্যাণকর কাজে উৎসাহিত করব। রাজ্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করব। অন্যায়কারীদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দেব। সব পানশালা, জুয়ার আড্ডা, অশ্লীলতা-বেহায়াপনার আসর উচ্ছেদ করব, আর সে স্থলে মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করব।...'
কিশোর খাদেমের মনে দরবেশের আন্তরিকতার ব্যাপারে কোন সন্দেহ ছিল না। সে মনে করত, মহান আল্লাহ অবশ্যই তার মুর্শিদের মত ভালমানুষের এহেন আন্তরিক দোয়া কবুল করবেন। আর দরবেশ বাদশাহ হলে তাকেও আর কোন কষ্ট করতে হবে না। কিন্তু দিনের পর দিন পার হয়ে যেতে থাকল। দরবেশ বয়স বেড়ে বার্ধক্যে উপনীত হলেন। খাদেম এখন টগবগে যুবক। কিন্তু দরবেশের দোয়া কবুল হওয়ার কোন লক্ষণ দেখা গেল না। ধীরে ধীরে খাদেমের বিশ্বাসে চির ধরল। শেষ পর্যন্ত অবস্থা এমন হল যে দরবেশ যখন দোয়ার জন্য হাত তুলতেন, খাদেমও তখন তার সাথে হাত তুলতে লাগল। কিন্তু তার কথা ছিল দরবেশের ঠিক বিপরীত। সে দোয়া করতে লাগল, তাকে বাদশাহ বানিয়ে দেয়া হলে সে তার প্রজাদের উপর যথাসম্ভব অত্যাচার করবে। অপরাধীদের সাজা দেয়ার পরিবর্তে পুরষ্কৃত করবে। মসজিদ মাদ্রাসা বন্ধ করে দিবে আর সব রকম অন্যায়, অশ্লীলতার দুয়ার উন্মুক্ত করে দিবে।
কিছুদিনের মধ্যেই দরবেশ-খাদেমের দোয়া কবুল হবার পরিস্থিতি সৃষ্টি হল। তাদের রাজ্যের রাজা মারা গেলেন, আর সিংহাসনের অধিকার নিয়ে রাজবংশের সদস্যরা বিবাদ শুরু করল। এমনকি অবস্থা খারাপ হতে হতে গৃহযুদ্ধ বাধার উপক্রম হল। যে যার অনুগত সেনাবাহিনী নিয়ে মহড়া দেয়া শুরু করল সিংহাসনের দাবিদারেরা। এহেন সংকটময় পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী এক অভিনব প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। ঠিক হল, বর্তমান দাবিদারদের কাউকেই রাজা বানানো হবে না, বরং রাজা নির্বাচনের ব্যাপারটি আল্লাহর ফয়সালার উপর ছেড়ে দেয়া হবে। পরদিন সূর্যদয়ের পরে প্রথম যে ব্যক্তিকে আল্লাহ পূর্ব দিক থেকে রাজধানীতে প্রবেশ করাবেন, তাকেই রাজা বানানো হবে। যথারীতি পরদিন পূর্বদিক থেকে সবার আগে রাজধানীতে প্রবেশ করল আমাদের যুবক খাদেম।
রাজা হয়ে খাদেম অক্ষরে অক্ষরে তার প্রতিজ্ঞা পালন করতে লাগল। জেলখানা থেকে সব দাগী আসামীদের ছেড়ে দেয়া হল। তাদের বদলে গ্রেফতার করা শুরু হল নিরপরাধ আলেম, দরবেশ ও সাধারণ মানুষদের। গরিবের উপর করের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হল। দুঃস্থদের ভাতা বন্ধ করে দেয়া হল। সব রকম জনকল্যাণমুলক প্রকল্প বাতিল করা হল। নতুন রাজা দুর্নীতিবাজ অসাধু কর্মকর্তাদের পুরষ্কৃত করতে লাগল, আর সৎ ও ত্যাগী কর্মকর্তাদেরকে শাস্তি দিতে লাগল। মোট কথা ভুতপূর্ব খাদেম রাজ্যকে পরিণত করল অন্যায়-অবিচার-অশান্তি-নির্যাতনের এক অভাবনীয় মডেলে।
শান্তিতে ছিলনা সেই প্রস্তাব পেশকারী মন্ত্রীও। মন্ত্রিত্ব তো অনেক আগেই হারিয়েছে, এখন সহায় সম্বলও হারানোর পথে। নিরুপায় হয়ে তিনি সুপারিশ করার জন্য লোক খুঁজতে লাগলেন। খুঁজতে খুঁজতে মন্ত্রী এক সময় সেই দরবেশের আস্তানায় গিয়ে পৌঁছলেন। দরবেশের হাতে-পায়ে ধরে অনুরোধ করলেন, 'বাবা যেন দয়া করে এই বিপদের হাত থেকে দেশবাসিকে মুক্ত করে দেন।'
সাবেক খাদেমের কীর্তি-কলাপের কথা আগেই শুনেছেন বয়োঃবৃদ্ধ দরবেশ। ফকির-দরবেশদের উপর নতুন রাজার আক্রোশের কথাও কারও অজানা ছিল না। কাজেই শিষ্যের মুখোমুখি হওয়ার কথা শুনে কিছুটা ভয় পেয়ে গেলেন তিনি। তারপরও মন্ত্রীর বারংবার অনুরোধ ফেলতে না পেরে খাদেমের সাথে কথা বলতে রাজি হলেন। পরদিন সকালে দরবেশ যেয়ে উপস্থিত হলেন রাজদরবারে।
রাজা হয়েও খাদেম কিন্তু তার মুর্শিদকে ভুলে যায়নি। অত্যন্ত আদবের সাথে সে দরবেশকে গ্রহণ করল। তার জন্য ব্যবস্থা করল শাহী খানা-দানার। আপ্যায়ন শেষে খাদেম দরবেশকে তার আগমনের হেতু জিজ্ঞেস করল। জবাবে দরবেশ বললেন, 'দেখ বাবা, আমি নিজের জন্য কিছুই চাইতে আসিনি। কিন্তু তুমি তো জান, মানুষের দুঃখ কষ্ট আমি দেখতে পারি না। আল্লাহর ওয়াস্তে তোমার প্রজাদের প্রতি একটু করুণা কর। একসময় এই তুমিই তাদের কাছে ভিক্ষা করতে, আজ আল্লাহ তোমাকে সম্মানিত করেছেন। কাজেই তাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। ভুলে যেও না, একদিন তোমাকেও মরতে হবে। আর আল্লাহর কাছে তোমার এই সব অন্যায় কাজের জবাবদিহি করতে হবে।'
দরবেশের এমন নিঃস্বার্থ আবদারে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল খাদেম। ক্রোধ-কম্পিত স্বরে বলল, 'দেখুন দরবেশ বাবা, আপনি আমার মুর্শিদ ছিলেন দেখে আজকে আপনাকে ছেড়ে দিচ্ছি। আমার আচরণের জন্য আপনি আমাকে যত খুশি বদদোয়া দিতে পারেন, অভিশাপ দিতে পারেন, কিন্তু এই প্রজাদের সাথে কোনরকম ভাল ব্যাবহার করতে বলবেন না। আমি ভুলে যাইনি যে আমি এক সময় এদের কাছেই ভিক্ষা করে খেতাম। কিন্তু আপনিও নিশ্চয়ই ভুলে যাননি, আমরা কে কী বলে আল্লাহর কাছে দোয়া করতাম। আপনি আমার চেয়ে অনেক বেশি পরহেজগার। আপনি বছরের পর বছর আল্লাহর কাছে অঙ্গীকার করেছেন, আপনি বাদশাহ হলে সুবিচারের সাথে শাসন করবেন। এই মানুষগুলো যদি ভাল ব্যবহারের উপযুক্তই হত, তাহলে তো আল্লাহ আমার পরিবর্তে আপনাকেই এদের বাদশাহ বানিয়ে দিতেন। কিন্তু আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করেছেন। এখন আমি তো শুধু আল্লাহর সাথে করা অঙ্গীকারটুকুই পূরণ করছি। আর আল্লাহর শপথ, এদের সাথে আমার আচরণের আমৃত্যু কোন পরিবর্তন হবে না।
দরবেশ অনেক্ষণ চুপ করে রইলেন। অবশেষে উঠে দাঁড়ালেন, আর শিষ্যকে বললেন, 'বাছা, তুমি ঠিকই বলেছ। এই লোকগুলো যদি কোন রকম ভাল আচরণের যোগ্য হত, তাহলে আমার এত বছরের দোয়া নিশ্চয়ই নিষ্ফল হত না। আল্লাহ তায়ালা এদেরকে শাস্তি দিতে চান বলেই তোমার হাতে রাজদন্ড দিয়েছেন। কাজেই তুমি নিঃশ্চিন্তে এদেরকে শায়েস্তা করতে থাক, আর এ ব্যাপারে কোন রকম কার্পণ্য করো না। আমি চললাম।'
Comments