সম্পাদনা: লেখা শেষ করে পোস্ট করার আগে খবর পেলাম, প্রধানমন্ত্রী সংসদে কোটা ব্যবস্থা বিলোপের ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও আমি এর বাস্তবায়নের ব্যাপারে আশাবাদী না, তবে আমার মতে এটা সংস্কারের চেয়ে ভালো বিকল্প।
মূল লেখা:
গত কয়েকদিন ধরে সরকারী চাকরীতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবীতে সারা দেশে আন্দোলন চলছে। এ ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত মতামত কিছুটা মিশ্র। আমি আন্দোলনের মূল দাবীর সাথে পুরোপুরি একমত নই, তবে বিশ্বাস করি যে আন্দোলনকারীদের দাবী অনুযায়ী কোটা সংস্কার করলে সেটা বর্তমান অবস্থার চেয়ে ভালো হবে। এছাড়াও আন্দোলনের পদ্ধতি, ফেসবুকে আন্দোলন সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে কিছু আপত্তি আছে। সেগুলো নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরছি।
১. আমি মনে করি, কোটা ব্যবস্থা একটা অন্যায় ব্যবস্থা। এখানে একদল মানুষকে আরেকদলের উপর অনায্য সুবিধা দেয়া হয়। যদিও সাধারণতঃ একদল সুবিধা-বঞ্চিত 'পিছিয়ে পড়া' মাইনরিটিকে 'এগিয়ে আনার' জন্য কোটার নামে অতিরিক্ত (অনায্য) সুবিধা দেয়া হয়, মূলতঃ এটা হল একটা অন্যায়কে আরেকটা অন্যায় দিয়ে প্রতিস্থাপন করা। শাসকের জন্য 'divide and rule' প্রয়োগের হাতিয়ার। তোমার উপর দশ বছর অন্যায় করা হয়েছে, এখন তুমি সুবিধা নাও আর তোমার ভাই বঞ্চিত হতে থাকুক। এটা অন্যায়কে নির্মূল করে না, বরং অন্যায়কে জিইয়ে রাখে। অন্যায়ের ভিকটিম একদল থেকে আরেকদলে পরিবর্তিত হয়। তাছাড়া কোটা ব্যবস্থা ইসলামের মূলনীতির সাথেও সাংঘর্ষিক। একারণে আমি কোটা ব্যবস্থার বিরোধী, সংস্কার নয়, এর পরিপূর্ণ বিলোপ চাই।
২. আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে এর পদ্ধতি নিয়ে আমার কিছু আপত্তি ছিল। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর ছবি নিয়ে মিছিল করার ব্যাপারে। একটা 'প্রাপ্য' অধিকার আদায়ের জন্য কেন আমাকে আগে আমার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে? দেশের নাম বাংলাদেশ, আওয়ামী লীগ না। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। সরকার বাংলাদেশের সরকার। বাংলাদেশের সব নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা তার দায়িত্ব। যে কোন বাংলাদেশী, সে গোপালগঞ্জের হোক বা বগুড়ার, হোক আওয়ামী লীগের বা বিএনপির, মুক্তিযোদ্ধা বা রাজাকার, তার বাংলাদেশী নাগরিকত্ব থাকলে সরকার তার ব্যাপারে দায়বদ্ধ। কিন্তু বাস্তবতা হল, আমাদের দেশে এটা মানা হয়না। কখনো হয়নি, নিকট ভবিষ্যতেও হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই। আমার মতে এটা কোটা প্রথার চেয়েও ভয়াবহ এবং সুদূরপ্রসারী অন্যায়। এই পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর ছবি নিয়ে মিছিল করা মানে এই বড় অন্যায় মেনে নিয়ে ছোট অন্যায় কমানোর (নির্মূল করা না) জন্য দাবী করা।
একই রকম মনোভাব দেখেছি কিছু ফেসবুক স্ট্যাটাসে। তারা আন্দোলনকারীদের সতর্ক করছে যেন ছাত্রদল বা শিবিরের কেউ আন্দোলনে 'অনুপ্রবেশ' করতে না পারে। কেন, ছাত্রদল বা শিবিরের কেউ কি ছাত্র না? তাদের চাকরী অধিকার নাই? তারা না আসলে তো আপনরাই বলবেন, তারা জনবিচ্ছিন্ন, গণমানুষের আন্দোলনের সাথে থাকে না। এক রাজনৈতিক দলের ছেলেরা পদত্যাগ করে আন্দোলনে এসেছে বলে আপনারা বাহবা দিচ্ছেন, অন্য রাজনৈতিক দলের ছেলেদের আন্দোলনে অংশ নিতে দিচ্ছেন না — এই দ্বিমুখিতা কেন?
৩. প্রথমদিকে কোটাবিরোধী আন্দোলনকে আমার মনে হয়েছিল সুবিধাবাদীদের আন্দোলন। এর মূল কারণ প্রথম প্যারায় বলা হয়েছে। আমি কোটা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিলোপ চাই। কোটা সংস্কার করা মানে এই অন্যায়কে জিইয়ে রাখা। যেন ডাকাতি বন্ধ করার দরকার নাই, আমার বাসায় না হলেই চলবে। এছাড়াও এই আন্দোলনে চুড়ান্ত পর্যায়ে খুব বেশি লাভ হবে না। কারণ বিসিএস এ মাত্র কয়েক হাজার ছাত্র-ছাত্রীর চাকরী হবে। বাকি লাখ লাখ বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করা 'সম্মানিত' বেকারদের কী হবে?
দ্বিতীয় কারণ হল, বিগত সময়ে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু চলে গেছে, হাজারগুণ বেশি অন্যায় হয়েছে, কিন্তু সেগুলো নিয়ে কোন আন্দোলন হয়নি। সবকিছু মেনে নেওয়া হয়েছি। কিন্তু যখন নিজের রুটি-রুজি হুমকির মুখে, তখন সবাই আন্দোলন করতে রাস্তায় নেমে এসেছে। আন্দোলন হওয়া দরকার ছিল বর্তমান সরকার যখন ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে ২০১৪ সালে ভোটার ছাড়াই নির্বাচিত হল। আন্দোলন হতে পারতো প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে, শিক্ষা ব্যবস্থার ধ্বংস নিয়ে। হতে পারতো বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নিয়ে, বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ড এবং পুলিশি নির্যাতন নিয়ে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোটভাইদের হলের ছাঁদে, বারান্দায়, গণরুমে থাকতে বাধ্য হওয়া নিয়ে, রাজনৈতিক দলের মিছিলে যেতে বাধ্য করা নিয়ে। আমার মতে, এর সবগুলো কোটার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক, এর ক্ষতিও অনেকগুন বেশি স্থায়ী। অথচ এসব কিছুই হয়নি। কাজেই এই আন্দোলনকে মহিমান্বিত করার কিছু নাই। ৫২, ৬৯ আর ৯০ এর ছাত্র আন্দোলনের সাথে তুলনা করা অবান্তর, আন্দোলনকারীদের সংখ্যাধিক্য ছাড়া আর কোন দিক দিয়ে এই আন্দোলন বড় না।
৪. কোটাবিরোধী আন্দোলনে পুলিশ আর ছাত্রলীগ হামলা করেছে। চরম অন্যায়, কিন্তু আমাদের দেশে নতুন কিছু না। এই সরকারের সময়ে সরকারী সমর্থনবিহীন প্রতিটা আন্দোলনে একই রকম হামলা হয়েছে, হোক সেটা রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক। গত কয়েক বছর ধরে দেখছি, কিছু ছাত্র শাহবাগ-টিএসসিতে এই কোটা সংস্কারের দাবীতেই পোস্টার নিয়ে বসার চেষ্টা করছে, আর ছাত্রলীগ-পুলিশ পিটিয়ে তুলে দিচ্ছে। তাহলে এবারের সাথে পার্থক্য কী? একই কাজ অল্পকিছু মানুষের সাথে করলে ঠিক আছে, আর বেশি মানুষের সাথে করলে অন্যায়? সরি, একমত হতে পারলাম না। যারা আন্দোলন করে আহত হয়েছে, আটককৃত হয়ে থানায়-হাজতে আছে, তাদের জন্য সমবেদনা। তাদের রক্তাক্ত বিভৎস ছবি-ভিডিও দেখে খুব কষ্ট পেয়েছি। ছাত্রলীগ-পুলিশ-সরকারের প্রতি ঘৃণা বেড়েছে, কিন্তু আন্দোলনকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা নাই।
৫. পরবর্তীতে পরিস্থিতি আয়ত্বের বাইরে চলে গেছে। অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটেছে, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হয়েছে। আন্দোলনকারীদের মোটিভ এখন আর কোটা সংস্কারে সীমাবদ্ধ নাই। এর সাথে যোগ হয়েছে মন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার, ছাত্রলীগ-পুলিশের হামলার বিচার, অটককৃতদের ছেড়ে দেওয়াসহ আরও অনেক কিছু। কিছু মানুষ সাহস হারিয়ে আন্দোলন থেকে সরে যাবে। নতুন অনেকেই তাদের আশেপাশের মানুষদের উপর হওয়া অন্যায় দেখে আন্দোলন করতে উদ্বুদ্ধ হবে। বর্তমান আন্দোলন আর আগের মত একমাত্রিক নাই। কাজেই উপরের ২ ও ৩ নম্বরের আপত্তিগুলোর অধিকাংশই আর বিদ্যমান নাই।
৬. দেশব্যাপি ইউনিভার্সিটির 'সাধারণ ছাত্র'দের এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে দেখছি, এটা একটা আশার দিক। তবে আমার জন্য চরম হতাশার হল, বিপুল জনগোষ্ঠীর এই আন্দোলন কোন প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে ঘিরে হচ্ছে না। কোটা প্রথা সংস্কার করা হবে কিনা, কতটুকু কমানো হবে, আমি সেই ব্যাপারে আগ্রহী না। আমার জন্য আশার দিক হল, কিছু মানুষ বুঝতে পারবে রাজনীতি পছন্দ না হলেও রাজনীতির প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়ার কোন উপায় নাই। হয়তো তারা রাজনীতি না করলেও রাজনৈতিকভাবে সচেতন হতে শিখবে। তবে একটা ব্যাপার নিশ্চিত, আওয়ামী লীগ-বঙ্গবন্ধু-মুক্তিযুদ্ধ-রাজাকার ইত্যাদি নিয়ে মানুষের ধারণা আর আগের মত থাকবে না।
Comments